টাকা ধার নিয়ে ইনভেস্টমেন্ট করা আদৌ কি নিরাপদ ? Loan Niye Investment Korle Profit Naki Loss Hoi

ঋণ সাধারণত দুই ধরনের—ভালো ঋণ ও খারাপ ঋণ। ভালো ঋণ হলো সেই ঋণ, যেখান থেকে আপনার আয়ের হার (rate of return) ঋণের সুদের হারের চেয়ে বেশি হয়। ধরুন, আপনি ১৫% সুদে ঋণ নিলেন, কিন্তু সেই অর্থ বিনিয়োগ করে যদি ২০–২৫% রিটার্ন পান, তাহলে সেটি ভালো ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে—ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা কি নিরাপদ? বিশেষ করে শেয়ারবাজারে। এখানে বিষয়টি বেশ জটিল। ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা মানেই সাধারণত মার্জিন লোন ব্যবহার করা, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের সময় অনেক বিনিয়োগকারী বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কেউ নিজের ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তা বাড়িয়ে ৩–৪ কোটিতে নিয়ে গেলেন। তখন তিনি আরও লাভের আশায় ২ কোটি টাকা মার্জিন লোন নিলেন, ফলে মোট বিনিয়োগ দাঁড়ালো ৩ কোটি টাকা। বাজার আরও বেড়ে তার পোর্টফোলিও ৫–৬ কোটিতে পৌঁছালেও তিনি শেয়ার বিক্রি করেননি।

কিন্তু বাজার চিরকাল ঊর্ধ্বমুখী থাকে না। পতন শুরু হলে অনেকেই মনে করেন, বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে পড়ে অনেকে সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ফলে দাম কমতে কমতে একসময় তার শেয়ারের মূল্য ১ কোটির নিচে নেমে আসে, অথচ তার ওপর ২ কোটি টাকার ঋণ রয়ে যায়।

এই অবস্থায় ব্রোকারেজ হাউস নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করে নিতে পারে। তখন বিনিয়োগকারীর মূলধন থাক বা না থাক, সেটি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে বিনিয়োগকারী বড় ক্ষতির মুখে পড়ে।

অবশ্য কিছু অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী মার্জিন লোন ব্যবহার করে লাভও করেছেন। কারণ তারা বাজারের গতিপ্রকৃতি বোঝেন, কোন শেয়ার ভালো করবে তা বিশ্লেষণ করতে পারেন। কিন্তু তবুও পুরোপুরি ঋণের ওপর নির্ভর করা কখনোই যুক্তিযুক্ত নয়। সাধারণভাবে নিজের মূলধনের তুলনায় সীমিত পরিমাণ ঋণ নেওয়াই তুলনামূলক নিরাপদ—যেমন সর্বোচ্চ ২০–২৫%।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যে শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন সেটি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা। কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল, ম্যানেজমেন্ট, ডিভিডেন্ড ইতিহাস, সম্পদ ও দায় (assets vs liabilities), এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি—সবকিছু বিবেচনা করতে হবে।

সংক্ষেপে বলা যায়, ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। এতে মানসিক চাপও অনেক বেশি থাকে এবং আর্থিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। তাই ধীরে ধীরে নিজের টাকায় বিনিয়োগ করা এবং প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করাই সবচেয়ে ভালো কৌশল।

শেয়ারবাজার সবসময় একটি চক্রের মধ্যে চলে—কখনো ঊর্ধ্বমুখী, কখনো নিম্নমুখী। তাই ধৈর্য ধরে থাকতে হবে, অতিরিক্ত লোভ বা ভয়—দুটোই এড়িয়ে চলতে হবে। যখন সবাই অতিরিক্ত লোভী হয়ে যায়, তখন সতর্ক হওয়া ভালো। আর যখন সবাই ভয় পায়, তখন সুযোগ খোঁজা যেতে পারে।

সবশেষে, জনতার স্রোতে ভেসে না গিয়ে নিজের বিশ্লেষণ ও কৌশলের ওপর ভরসা করাই একজন সচেতন বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় শক্তি।

Leave a Comment

error: Content is protected !!